🫀 হার্ট (হৃদপিণ্ড) সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য
আপনি কি নির্দিষ্ট কোনো বিষয় জানতে চান? যেমন:
👉 হার্ট অ্যাটাক হলে কী করবেন
👉 স্টেন্ট বা বাইপাস কী
👉 বুকের ব্যথা সবসময় হার্টের সমস্যা কিনা
👉 হার্টের টেস্ট (ECG, Echo, Angiogram) সম্পর্কে
📍 হার্ট কোথায় থাকে?
হার্ট বুকের মাঝখানে, একটু বাম পাশে থাকে। এটি মুঠির সমান আকারের একটি শক্তিশালী পেশী।
🔄 হার্টের গঠন (Structure)
হার্টের ৪টি কক্ষ (চেম্বার) আছে:
ডান অলিন্দ (Right Atrium)
ডান নিলয় (Right Ventricle)
বাম অলিন্দ (Left Atrium)
বাম নিলয় (Left Ventricle)
এছাড়া ৪টি ভাল্ভ (Valve) আছে, যা রক্তকে একদিকে চলতে সাহায্য করে।
⚙️ হার্ট কীভাবে কাজ করে?
হার্ট একটি পাম্পের মতো কাজ করে।
👉 ডান পাশ শরীর থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত নেয় → ফুসফুসে পাঠায়
👉 ফুসফুস রক্তে অক্সিজেন দেয়
👉 বাম পাশ অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সারা শরীরে পাঠায়
প্রতি মিনিটে সাধারণত ৬০–১০০ বার স্পন্দন করে।
❤️ হার্টের প্রধান কাজ
শরীরে অক্সিজেন পৌঁছানো
পুষ্টি সরবরাহ
বর্জ্য পদার্থ সরানো
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা
⚠️ হার্টের সাধারণ রোগ
১. হার্ট অ্যাটাক
রক্তনালীতে ব্লক হলে হার্টের অংশে রক্ত পৌঁছায় না।
২. উচ্চ রক্তচাপ
দীর্ঘদিন উচ্চ প্রেসার থাকলে হার্ট দুর্বল হয়।
৩. হার্ট ব্লক/করোনারি আর্টারি ডিজিজ
রক্তনালী সরু বা বন্ধ হয়ে যায়।
৪. হার্ট ফেইলিউর
হার্ট ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে পারে না।
৫. অনিয়মিত হার্টবিট (Arrhythmia)
হার্টবিট খুব দ্রুত বা ধীর হয়ে যায়।
🚨 বিপদের লক্ষণ
বুকের মাঝখানে চাপ/ব্যথা
বাম হাতে বা চোয়ালে ব্যথা ছড়ানো
শ্বাসকষ্ট
অতিরিক্ত ঘাম
মাথা ঘোরা
⚠️ এসব হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
🥗 হার্ট ভালো রাখার উপায়
✅ প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা
✅ ধূমপান বন্ধ
✅ কম তেল-চর্বি খাওয়া
✅ লবণ কম খাওয়া
✅ ওজন নিয়ন্ত্রণ
✅ নিয়মিত প্রেসার ও সুগার পরীক্ষা
📊 কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
হার্ট দিনে প্রায় ১ লক্ষ বার স্পন্দিত হয়
দিনে প্রায় ৭–৮ হাজার লিটার রক্ত পাম্প করে
সুস্থ জীবনযাপন করলে ৮০% হার্ট রোগ প্রতিরোধ সম্ভব
হার্ট অ্যাটাক হলে কী করবেন
হার্ট অ্যাটাক হলে কী করবেন (জরুরি করণীয়)
হার্ট অ্যাটাক প্রাণঘাতী হতে পারে — তাই সময় নষ্ট না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।
🚨 হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ
বুকের মাঝখানে চাপ/ব্যথা (৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী)
ব্যথা বাম হাত, কাঁধ, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে যাওয়া
শ্বাসকষ্ট
অতিরিক্ত ঘাম
বমি বমি ভাব
হঠাৎ দুর্বল লাগা
⚠️ ডায়াবেটিস রোগী ও নারীদের ক্ষেত্রে কখনও শুধু শ্বাসকষ্ট বা অস্বস্তিও হতে পারে।
🆘 সাথে সাথে যা করবেন
১️⃣ জরুরি নম্বরে ফোন করুন
বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এ কল করুন।
অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন — নিজে গাড়ি চালিয়ে না যাওয়াই ভালো।
২️⃣ রোগীকে বসান বা শোয়ান
আধা বসা অবস্থায় রাখুন
টাইট কাপড় ঢিলা করুন
শান্ত রাখুন
৩️⃣ অ্যাসপিরিন খাওয়ান (যদি অ্যালার্জি না থাকে)
৩০০ মি.গ্রা. অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়াতে পারেন
এতে রক্ত জমাট কমে
(ডাক্তারি পরামর্শ থাকলে ভালো, তবে জরুরি অবস্থায় সাধারণত দেওয়া হয়)
৪️⃣ CPR জানলে শুরু করুন (যদি রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়)
রোগী সাড়া না দিলে
শ্বাস না থাকলে
👉 বুকের মাঝখানে জোরে চাপ দিন (প্রতি মিনিটে ১০০–১২০ বার)
👉 সাহায্য আসা পর্যন্ত চালিয়ে যান
❌ যা করবেন না
রোগীকে হাঁটতে বলবেন না
অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দেবেন না
সময় নষ্ট করবেন না
গরম পানি/তেল/ঘরোয়া চিকিৎসা করবেন না
🏥 হাসপাতালে কী করা হয়?
ECG
রক্ত পরীক্ষা (Troponin)
প্রয়োজন হলে Angiogram
ব্লক থাকলে স্টেন্ট
গুরুতর হলে বাইপাস সার্জারি
⏳ মনে রাখবেন
হার্ট অ্যাটাকের প্রথম ১ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ — একে “Golden Hour” বলা হয়।
এই সময় চিকিৎসা শুরু হলে প্রাণ বাঁচার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
স্টেন্ট বা বাইপাস কী
স্টেন্ট ও বাইপাস কী?
হার্টে রক্ত পৌঁছায় করোনারি ধমনীর মাধ্যমে।
যদি এই রক্তনালীতে চর্বি জমে ব্লক (Blockage) হয়, তখন হার্টে রক্ত কম যায় → বুকের ব্যথা বা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
এই ব্লক ঠিক করার দুটি প্রধান পদ্ধতি হলো:
🔹 ১️⃣ স্টেন্ট (Stent) কী?
👉 স্টেন্ট হলো ছোট জালের মতো ধাতব টিউব
এটি ব্লক হওয়া রক্তনালীর ভিতরে বসানো হয়, যাতে নালী খোলা থাকে।
🏥 কীভাবে দেওয়া হয়?
হাত বা পায়ের রক্তনালী দিয়ে চিকন তার ঢোকানো হয়
Angiogram করে ব্লকের জায়গা দেখা হয়
ব্লকের জায়গায় বেলুন ফোলানো হয়
তারপর সেখানে স্টেন্ট বসানো হয়
পুরো প্রক্রিয়া সাধারণত ৩০–৬০ মিনিট
✅ কবে করা হয়?
১–২টি ব্লক থাকলে
জরুরি হার্ট অ্যাটাক হলে
ব্লক কম জটিল হলে
👍 সুবিধা
বড় কাটাছেঁড়া লাগে না
দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়
২–৩ দিনের মধ্যে বাসায় ফেরা যায়
🔹 ২️⃣ বাইপাস সার্জারি (Bypass Surgery) কী?
👉 ব্লক অংশ এড়িয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়
ডাক্তার শরীরের অন্য রক্তনালী (পা/বুক থেকে) নিয়ে ব্লক অংশের উপর দিয়ে নতুন পথ বানান।
🏥 কীভাবে করা হয়?
বুকের মাঝখানে অপারেশন
হার্ট সার্জন অপারেশন করেন
সময় লাগে ৩–৬ ঘণ্টা
৫–৭ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়
✅ কবে করা হয়?
৩টি বা বেশি ব্লক
বড় বা জটিল ব্লক
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ভালো অপশন
👍 সুবিধা
দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর
গুরুতর ব্লকে ভালো সমাধান
📊 স্টেন্ট বনাম বাইপাস (সহজ তুলনা)
বিষয় স্টেন্ট বাইপাস
কাটাছেঁড়া নেই আছে
সময় কম বেশি
হাসপাতাল থাকা ২–৩ দিন ৫–৭ দিন
ব্লকের সংখ্যা কম হলে বেশি হলে
ঝুঁকি কম তুলনামূলক বেশি
❗ গুরুত্বপূর্ণ কথা
সব রোগীর জন্য একই চিকিৎসা নয়।
ডাক্তার Angiogram রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নেন — স্টেন্ট হবে না বাইপাস হবে।
বুকের ব্যথা সবসময় হার্টের সমস্যা কিনা
হার্টের কারণে বুকের ব্যথা
হার্টের কারণে বুকের ব্যথাকে Angina বা Heart Attack বলা হয়।
লক্ষণগুলো সাধারণত:
বুকের মাঝখানে চাপ বা ভারী ভাব
ব্যথা বাম হাত, কাঁধ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে যাওয়া
শ্বাসকষ্ট
অতিরিক্ত ঘাম
বমি বা দুর্বল লাগা
বিশেষ লক্ষণ:
ব্যথা বিশ্রামে কমে না
কিছুক্ষণের বেশি স্থায়ী (৫–১৫ মিনিট)
হঠাৎ শুরু হয়
🔹 হার্ট ছাড়া বুকের ব্যথার সাধারণ কারণ
পেট বা হজম সমস্যা
অ্যাসিড রিফ্লাক্স (Acid Reflux, Heartburn)
বদহজম বা গ্যাসের চাপ
ব্যথা সাধারণত খেতে বা শোয়ায় বৃদ্ধি পায়
পেশী ও হাড়ের সমস্যা
বুকের পেশীর টান বা ইনজুরি
ব্যথা স্পর্শ করলে বেড়ে যায়
সাধারণত ব্যথা নিস্ক্রিয় অবস্থায় কমে
শ্বাসনালি ও ফুসফুসের সমস্যা
অ্যাজমা (Asthma)
ফুসফুসে সংক্রমণ বা পলমোনারি ইমবোলিজম
শ্বাসকষ্ট ও কাশি থাকে
মানসিক চাপ / Panic Attack
হঠাৎ ভয়, ঘাম, দ্রুত হৃদস্পন্দন
বুকের ব্যথা থাকে, কিন্তু হার্ট ঠিক থাকে
🔹 কবে জরুরি মনে করবেন
ব্যথা বাম হাত, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে যাচ্ছে
শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত ঘাম হচ্ছে
কখনও ব্যথা নিস্ক্রিয় অবস্থায়ও কমছে না
হার্ট অ্যাটাকের পূর্ব লক্ষণ মনে হচ্ছে
⚠️ এই ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে যান বা ৯৯৯ এ কল করুন।
💡 টিপস:
বুকের ব্যথা সবসময় হার্ট নয়, কিন্তু কখনও উপেক্ষা করবেন না।
যদি নতুন বা অজানা ব্যথা হয়, পরীক্ষা করানো নিরাপদ।
হার্টের টেস্টগুলো: ECG, Echo, Stress Test, Angiogram
হার্টের টেস্টসমূহ
হার্টের স্বাস্থ্য নিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হয়। প্রধানত তিনটি:
১️⃣ ECG (Electrocardiogram)
কী?
হার্টের বিদ্যুৎ সংকেত (Electrical signals) রেকর্ড করা হয়।
কেন করা হয়?
হার্টবিট ঠিক আছে কিনা চেক করতে
অনিয়মিত হার্টবিট (Arrhythmia) খুঁজতে
হার্ট অ্যাটাক হয়েছে কিনা দেখতে
কিভাবে করা হয়?
বুক, হাত ও পায়ে ছোট ইলেকট্রোড বসানো হয়
৫–১০ মিনিটের মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যায়
সুবিধা
দ্রুত, বেদনা নেই
সস্তা ও সহজ
২️⃣ Echo (Echocardiogram / Echo Cardiography)
কী?
হার্টের সন (Ultrasound) পরীক্ষা। হার্টের পাম্পিং, ভালভ এবং রক্তের প্রবাহ দেখা যায়।
কেন করা হয়?
হার্টের ভালভ ঠিক আছে কিনা
হার্ট পাম্প করছে ঠিকভাবে কিনা
হার্ট ফেইলিউর বা ব্লক নির্ণয় করতে
কিভাবে করা হয়?
জেল লাগিয়ে ট্রান্সডিউসার দিয়ে বুকের উপর সন করা হয়
২০–৩০ মিনিট সময় লাগে
বেদনা নেই
সুবিধা
হার্টের গঠন এবং কাজ একসাথে দেখা যায়
কোনো ক্ষতিকর রেডিয়েশন নেই
৩️⃣ Angiogram (Coronary Angiography)
কী?
হার্টে রক্তনালীর বন্ধ বা সরু অংশ খুঁজে বের করা হয়।
কেন করা হয়?
হার্ট অ্যাটাক বা Angina (বুকের ব্যথা) হলে
ব্লকেজ কতটা তা দেখতে
পরবর্তী স্টেন্ট বা বাইপাসের পরিকল্পনা করতে
কিভাবে করা হয়?
হাতে বা পায়ের রক্তনালীতে পাতলা তার (Catheter) ঢোকানো হয়
রঙিন কেমিক্যাল (Contrast dye) দিয়ে এক্স-রে তে দেখা হয়
৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লাগে
সুবিধা
ব্লকেজ ঠিক জায়গায় দেখা যায়
দ্রুত স্টেন্ট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়
📊 তুলনা – সহজে
টেস্ট মূল লক্ষ্য সময় বেদনা ব্যবহার
ECG হার্ট রিদম ৫–১০ মিনিট নেই Arrhythmia, Heart Attack চেক
Echo হার্টের গঠন ও কাজ ২০–৩০ মিনিট নেই Valve, Pumping, Heart Failure
Angiogram রক্তনালী ব্লক ৩০–৬০ মিনিট হালকা Coronary Blockage, Stent Planning
💡 টিপস:
বুক ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে প্রথমে ECG করা হয়।
প্রয়োজন হলে Echo ও পরে Angiogram।
Angiogram করার পর স্টেন্ট বা বাইপাসের সিদ্ধান্ত হয়।
0 Comments